নিজস্ব প্রতিবেদক | বাস্তব কণ্ঠ
সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য নীতিমালার সীমা অতিক্রম করে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার ঘটনায় প্রায় ১১৬ কোটি টাকা ফেরত আদায় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনার পরও দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও বিতরণ করা বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বছরে সর্বোচ্চ তিনটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য দেওয়া হয় পাঁচটি বোনাস। এতে নীতিমালার নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত দুটি বোনাস বিতরণ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে নিরীক্ষা আপত্তি ওঠে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকও এ বিষয়ে সম্মতি দেয়নি বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই দিন পর, ৭ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আফজাল করিমকে একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী অবরুদ্ধ করেন। তাঁদের অন্যতম দাবি ছিল বছরে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস নিশ্চিত করা।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ ছিল না। বোনাসের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি একপর্যায়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করে।
এরই মধ্যে ২০ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে তাঁর নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ চাপের মুখে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস অনুমোদন করেছিল বলে জানা যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়ে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ ফেরত আনার নির্দেশ দেয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু নির্দেশ জারির প্রায় দেড় বছর পরও সেই অর্থ ফেরত আদায়ের কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৫ সালের কোনো নীতিমালাতেই সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি উৎসাহ বোনাস গ্রহণের সুযোগ ছিল না।
বাড়তি বোনাস বিতরণের পর সোনালী ব্যাংক তা অনুমোদনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আবেদন করে এবং নীতিমালা লঙ্ঘনের জন্য ক্ষমাও চায়। তবে বিভাগটি নিজেদের নীতিমালা লঙ্ঘন করে পাঁচটি বোনাস অনুমোদনের পথে যায়নি বলে জানা গেছে।
পরবর্তীতে ২৮ আগস্ট সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগের আগ পর্যন্ত তিনিও বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত অর্থ ফেরত বা বোনাসসংক্রান্ত জটিলতার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
সোনালী ব্যাংকের একজন পরিচালক বলেন, একশ্রেণির কর্মচারী ‘মব’ করে বোনাস আদায় করায় পুরো ব্যাংক জটিলতার মধ্যে পড়েছে। তাঁর দাবি, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এ সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান কঠিন। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে অর্থ চলে যাওয়ার পর তা ফেরত আনার বাস্তবতাও কম বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তবে এ ঘটনায় কার কী দায় এবং অর্থ ফেরত আদায়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, নিরীক্ষা আপত্তির নিষ্পত্তি এবং নীতিমালাবহির্ভূত অর্থ পুনরুদ্ধার—এই তিনটি বিষয়েই সোনালী ব্যাংকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
তথ্যসূত্র: আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের চিঠি (২৭ মার্চ ২০২৫), সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সূত্র ও প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য।
প্রিন্ট করুন ফটো কার্ড