ফিউচার হাউজিংয়ের জবরদখল ও অনিয়মের নেপথ্যে প্রভাবশালী চক্র
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, ঢাকা:
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলা ৪০ ফিট এলাকার কোমলমতি শিশুদের খেলাধুলার একমাত্র উন্মুক্ত স্থানটি জবরদখলের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় এক দশক ধরে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসা ‘রাজধানী মডেল স্কুল’-এর শিক্ষার্থীরা যে জমিটি খেলাধুলার জন্য ব্যবহার করে আসছিল, তা ভুয়া অজুহাতে দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে একটি প্রভাবশালী আবাসন ব্যবসায়ী চক্র। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে মূল উদ্দেশ্য হাসিল করতেই ‘মসজিদ নির্মাণ’-এর দোহাই দিয়ে এই জমি দখলের চক্রান্ত চলছে।
নাগরিক সুবিধার বালাই নেই, তবুও বহাল তবিয়তে
দখলদাররা:
আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আবাসন প্রকল্প হিসেবে ‘ফিউচার হাউজিং’-এর যে ন্যূনতম অবকাঠামোগত ভিত্তি থাকা দরকার, তার প্রায় কিছুই নেই। একটি পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্পে বাসিন্দা ও স্থানীয়দের জন্য প্রয়োজনীয় সুপেয় পানির পাম্প (ওয়াসা), স্থায়ী মসজিদ কিংবা অন্যান্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হলেও ফিউচার হাউজিং কর্তৃপক্ষের সেরকম কোনো গোছালো ব্যবস্থা নেই। নিজস্ব প্রকল্পে নাগরিক সুবিধা প্রদানে চরমভাবে ব্যর্থ হলেও এই আবাসন প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা এখন শিশুদের জন্য বরাদ্দ ও ব্যবহৃত উন্মুক্ত মাঠ জবরদখলে মেতে উঠেছেন।
দখলের নেপথ্যে যারা:
অনুসন্ধানে ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগে জানা যায়, ফিউচার হাউজিংয়ের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা পেশিশক্তি ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এই মাঠ দখলের চেষ্টা চালাচ্ছেন। এর নেপথ্যে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে:
* এস এম আহমেদ আলী: চেয়ারম্যান (ফিউচার হাউজিং) ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সম্প্রতি ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি লাঠিয়াল ও দখলদার বাহিনী নিয়ে এসে মাঠটি জবরদখল করার চেষ্টা চালান।
* শামীম কোম্পানি: ডিরেক্টর, ফিউচার হাউজিং, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
* মোহাম্মদ সুমন: ম্যানেজার, ফিউচার হাউজিং, মোহাম্মদপুর।
স্থানীয়দের দাবি, নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ উদ্ধার ও অবৈধ জমি দখলের পাঁয়তারা ঢাকতেই এরা ‘মসজিদ নির্মাণ’-এর উসিলাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
শিশুদের শৈশব ও মানসিক বিকাশ চরম হুমকির মুখে:
২০১৪ সাল থেকে সুনামের সাথে পরিচালিত হয়ে আসছে ‘রাজধানী মডেল স্কুল’। বিদ্যালয়টিতে নিজস্ব খেলার মাঠ না থাকায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। পরবর্তীতে স্থানীয় ‘স্বপ্নধারা হাউজিং বাড়ি ও ফ্ল্যাট মালিক সমিতি’র সাথে আলোচনা ও মতবিনিময় করে এলাকার একটি পরিত্যক্ত খাস জমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলার উপযোগী করে তোলে।
কিন্তু হঠাৎ করেই ফিউচার হাউজিংয়ের এই প্রভাবশালী চক্রটি উক্ত জায়গায় শিক্ষার্থীদের ব্যবহারে চরম বাধা সৃষ্টি শুরু করে। একের পর এক অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে শিশুদের খেলাধুলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। খেলাধুলার উপযুক্ত পরিবেশ না থাকলে এ এলাকার কোমলমতি শিশুদের ভবিষ্যৎ মানসিক ও শারীরিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও শিক্ষকরা।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ:
ইতোমধ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি উল্লেখ করে রাজধানী মডেল স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মোহাম্মদপুর থানায় একটি লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তবে সুশীল সমাজ ও এলাকার সাধারণ মানুষের দাবি—শুধুমাত্র জিডি বা আবেদনেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, প্রশাসনকে অবিলম্বে সরেজমিনে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জোর দাবি: অবিলম্বে মাঠ উদ্ধার: ফিউচার হাউজিংয়ের চেয়ারম্যান এস এম আহমেদ আলী, পরিচালক শামীম কোম্পানি ও ম্যানেজার সুমনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে শিশুদের খেলাধুলার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।
হাউজিংয়ের বৈধতা ও সুবিধাদি যাচাই: যেসব হাউজিং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সুপেয় পানির পাম্প, মসজিদ ও ন্যূনতম সুবিন্যস্ত নাগরিক সুবিধা নেই, তাদের প্রকল্পের বৈধতা ও আবাসন ব্যবসার অনুমোদন নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক।
ভূমিদস্যুতার সুষ্ঠু তদন্ত: ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ভুয়া দোহাই দিয়ে জমি জবরদখলের পেছনে থাকা ভূমিদস্যুদের আসল চেহারা উন্মোচন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুদের খেলার সুযোগ কেড়ে নেওয়া মানে তাদের একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ থেকে বঞ্চিত করা। ফিউচার হাউজিংয়ের প্রভাবশালী চক্রের অপতৎপরতা বন্ধে রাজউক, সিটি করপোরেশন, পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের এখনই কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রিন্ট করুন
ফটো কার্ড
এ জাতীয় আরো খবর..