বাস্তব কণ্ঠ অনুসন্ধান | পর্ব-২
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে রাতের হামলার ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণগুলোর একটি হতে পারে সিসিটিভি ফুটেজ।
কারণ মামলার অভিযোগে যেখানে দুই শতাধিক মানুষের হামলা, নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে রাখা, ভেকু দিয়ে ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং লাখ লাখ টাকার মালামাল লুটের কথা বলা হয়েছে, সেখানে সিসিটিভি থেকে জানা যেতে পারে—কারা আগে এসেছিল, কারা পরে এসেছে, কারা ভেতরে ঢুকেছে এবং লুট করা মালামাল কীভাবে সরানো হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন ফুটেজের কথা সামনে এসেছে, যেখানে একটি এক্সকাভেটরকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যেতে এবং পরে লুট করা মালামাল পিকআপে তোলার দৃশ্য থাকার কথা বলা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ঘটনাস্থলের বাইরে পুলিশের গাড়ি থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি পরিকল্পিত অভিযানে সাধারণত কয়েকটি ধাপ থাকে—লোক জড়ো করা, প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তাকর্মীদের অচল করা, মূল্যবান সামগ্রী সরানো এবং অবকাঠামো ধ্বংস করা।
রাড্ডার ঘটনাতেও মামলার বর্ণনায় এমন একাধিক ধাপের কথা পাওয়া যায়।
প্রথমে নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। এরপর প্রধান ফটক ভাঙা হয়। তারপর ভেকু ঢোকানো হয়। একাধিক ভবন ভেঙে ফেলার পাশাপাশি বিভিন্ন সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হয়।
এ কারণে তদন্তকারীদের জন্য সিসিটিভির সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবন ভাঙার জন্য যে ভারী যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত চালক প্রয়োজন।
তাই তদন্তে অন্তত পাঁচটি তথ্য যাচাই করা দরকার:
১. ভেকুটির মালিক কে?
২. সেটি কোথা থেকে ঘটনাস্থলে আসে?
৩. চালক কে ছিলেন?
৪. কখন সেটি ভাড়া করা হয়েছিল?
৫. ভাড়া বা পরিবহনের অর্থ কে পরিশোধ করেছে?
এই তথ্যগুলো পাওয়া গেলে ঘটনার প্রস্তুতি কত আগে শুরু হয়েছিল, তার একটি সম্ভাব্য চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
ঘটনার পর ডিএমপি জানিয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে লুট হওয়া মালামালভর্তি দুই ট্রাক উদ্ধার করা হয়েছে। একই ঘটনায় এখন পর্যন্ত নয়জন গ্রেপ্তারের তথ্যও পুলিশ জানিয়েছে।
এখন অনুসন্ধানের বিষয় হলো—উদ্ধার হওয়া দুই ট্রাকে কী কী ছিল?
মামলায় যেসব সামগ্রীর কথা বলা হয়েছে, তার কতগুলো উদ্ধার হয়েছে?
দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন কি উদ্ধার হয়েছে?
জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি ও ওষুধের কত অংশ উদ্ধার করা হয়েছে?
এসব সামগ্রীর সিরিয়াল নম্বর বা ইনভেন্টরি তালিকা দিয়ে উদ্ধার করা মালামাল মিলিয়ে দেখা গেলে লুটের পরিমাণ সম্পর্কে আরও নির্ভুল চিত্র পাওয়া সম্ভব।
সিসিটিভি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ঘটনাস্থলের বাইরে পুলিশের গাড়ি থাকার কথা উঠে এসেছে।
এই তথ্য সত্য হলে তদন্তের জন্য সময়ের হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশের গাড়িটি কখন সেখানে পৌঁছেছিল?
পুলিশ সদস্যরা কী দেখেছিলেন?
তারা কি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করেছিলেন?
নিরাপত্তাকর্মীদের উদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন?
ভেকু দিয়ে ভবন ভাঙার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছিল কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে সিসিটিভি, পুলিশি ডিউটি রোস্টার, ওয়্যারলেস লগ, কল রেকর্ড এবং ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ওপর।
ঘটনার পর শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ডিএমপির পক্ষ থেকে পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখার কথাও জানানো হয়েছে।
তবে ওসি প্রত্যাহার করাই পুলিশের গাফিলতি প্রমাণ করে না। এটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত; প্রকৃত দায় বা অবহেলা ছিল কি না তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়।
এ কারণেই অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—ঘটনার আগে পুলিশ কী জানত, ঘটনার সময় কী দেখেছিল এবং ঘটনার পর কী ব্যবস্থা নিয়েছিল?
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর মিললেই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।
চলবে—পরবর্তী পর্বে: “১ কোটি ৯ লাখ টাকার ক্ষতি—এজাহারের হিসাব কতটা যাচাইযোগ্য?”
প্রিন্ট করুন ফটো কার্ড