বাস্তব কণ্ঠ অনুসন্ধান
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। রাত তখন গভীর। হঠাৎ ভারী যন্ত্রের শব্দ। একে একে ঢুকছে লোকজন। কারও হাতে হ্যামার, কারও হাতে লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র। প্রথমেই নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হলো নিরাপত্তাকর্মীদের। এরপর শুরু হলো ভাঙচুর, লুটপাট এবং শেষ পর্যন্ত ভেকু দিয়ে ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজ।
এটি কোনো সাধারণ চুরি বা আকস্মিক হামলার ঘটনা ছিল কি না—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ঘটে যাওয়া ঘটনায় এ পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষ রোববার আরও ছয়জনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, রাত আনুমানিক ১২টা ৫ মিনিটে হ্যামার, লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একদল ব্যক্তি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করেন। তারা সীমানাপ্রাচীর টপকে ভেতরে ঢুকে দুই নৈশপ্রহরীকে মারধর করে বেঁধে রাখেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর হামলাকারীরা প্রধান ফটক ভেঙে একটি ভেকু ভেতরে নিয়ে যায়। একের পর এক স্থাপনা ভাঙা শুরু হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিভিন্ন ভবন ও কক্ষ ভাঙচুরের পাশাপাশি দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি, স্টিলের আলমারি, ওষুধসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যাওয়া হয়।
এসব মালামালের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। অবকাঠামো ও অন্যান্য ক্ষতি মিলিয়ে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ টাকা বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
অর্থাৎ প্রশ্ন উঠছে—যদি উদ্দেশ্য শুধু ভবন ভাঙা হয়ে থাকে, তাহলে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, কম্পিউটার ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন কেন হলো?
এই ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একটি ভারী এক্সকাভেটর বা ভেকু কীভাবে গভীর রাতে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করল?
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রকাশিত সিসিটিভি-ভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লুটপাট শুরুর আগে একটি এক্সকাভেটর ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির দিকে এগিয়ে আসে। একই প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মালামাল পিকআপে তোলার দৃশ্য এবং ঘটনাস্থলের কাছে পুলিশের গাড়ি থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানেই অনুসন্ধানের বড় প্রশ্ন:
ভেকুটি কার? কে সেটি ভাড়া বা সরবরাহ করেছিল? চালক কে? তাকে কে নির্দেশ দিয়েছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা গেলে হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
মামলার অভিযোগ এবং বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের ব্যানার ও সাইনবোর্ড লাগানো হয়।
এই সমিতির সঙ্গে হামলার ঘটনাটির প্রকৃত সম্পর্ক কী—সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
সমিতিটি কি সত্যিই সেখানে কোনো বৈধ কার্যক্রম চালানোর দাবি করেছিল? জমি বা স্থাপনা নিয়ে তাদের কোনো বিরোধ ছিল কি না? তাদের নামে কোনো লিখিত নোটিশ, আদালতের আদেশ বা প্রশাসনিক অনুমোদন ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো প্রকাশ্যে পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
ঘটনার পর শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে এটি প্রশাসনিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও অন্য প্রতিবেদনে ঘটনাটির সঙ্গে পুলিশের দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, পুলিশি অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি না তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ফলে অনুসন্ধানের পরবর্তী প্রশ্ন:
দুই শতাধিক লোকের একটি দল, একটি ভেকু এবং লুটের মালামাল পরিবহনের যানবাহন—এসব কি স্থানীয় পুলিশ টের পায়নি?
আর যদি টের পেয়ে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্তেই পরিষ্কার হওয়ার কথা।
চলবে—পরবর্তী পর্বে: “পুলিশের গাড়ির সামনে মালামাল ওঠানো হলো? সিসিটিভির প্রতিটি মিনিটের হিসাব”