Logo
প্রিন্টের তারিখ: 17 October 2026 | প্রকাশের তারিখ: Oct 18, 2026

সংবাদ শিরোনাম : বাংলার জ্যোতি–সৌরভ: সতর্কবার্তার পরও দুর্ঘটনা, তদন্তের পর জাহাজ বিক্রি—জবাবদিহি কোথায়?

বাংলার জ্যোতি–সৌরভ: সতর্কবার্তার পরও দুর্ঘটনা, তদন্তের পর জাহাজ বিক্রি—জবাবদিহি কোথায়?
৪ প্রাণহানির দুই দুর্ঘটনা থেকে ৪৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকার স্ক্র্যাপ বিক্রি—অমীমাংসিত রয়ে গেছে নিরাপত্তা ও দায়ের প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদন | দৈনিক বাস্তব কণ্ঠ

চট্টগ্রাম বন্দরে মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) দুই তেলবাহী জাহাজ ‘বাংলার জ্যোতি’ ও ‘বাংলার সৌরভ’-এ অগ্নিকাণ্ড এবং চারজনের প্রাণহানির ঘটনা এখনো নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ‘বাংলার জ্যোতি’তে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে তিনজন নিহত হন। পরে ৫ অক্টোবর ‘বাংলার সৌরভ’-এ অগ্নিকাণ্ডে আরও একজনের মৃত্যু হয়। ‘বাংলার জ্যোতি’র ঘটনায় সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের খবরও তখন প্রকাশিত হয়েছিল।

কিন্তু দুর্ঘটনার আগের নথিগুলো পর্যালোচনা করলে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে আসে।

দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকির তথ্য ছিল?

দৈনিক জাগ্রত সময়ের অনুসন্ধানে উদ্ধৃত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ১ অক্টোবর ২০২৪-এর চিঠিতে বলা হয়েছিল, দুই জাহাজই ১৯৮৯ সালে নির্মিত পুরোনো জাহাজ এবং দীর্ঘ ব্যবহারের কারণে এগুলোর পরিচালনাগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় জাহাজের গতি কমে যাওয়া, নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং অন্য জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কার কথাও নথিতে উল্লেখ ছিল।

অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু দুর্ঘটনার সময় কী ঘটেছিল—তা নয়।

প্রশ্ন হলো, ঝুঁকির তথ্য আগে থেকেই থাকার পরও ঝুঁকি কমাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?

‘বাংলার সৌরভ’-এর সনদ নিয়ে প্রশ্ন

আরও গুরুতর তথ্য হলো, জাগ্রত সময়ের প্রতিবেদনে ব্যুরো ভেরিটাসের ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এর লিখিত বার্তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে নির্ধারিত বার্ষিক পরিদর্শন সম্পন্ন না হওয়ায় ‘বাংলার সৌরভ’-এর সনদ স্থগিত থাকার কথা বলা হয়েছে।

এই তথ্যের সঙ্গে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ মিলিয়ে এখন তদন্তের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হতে পারে—

সনদ স্থগিত হওয়ার পর জাহাজটি কীভাবে এবং কোন বৈধতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছিল?

এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে সনদ পুনর্বহালের মূল নথি প্রকাশ করা প্রয়োজন।

জাহাজে বিদ্যুৎ উৎপাদনযন্ত্র: অভিযোগ কতটা সত্য?

বিএসসির একটি অভ্যন্তরীণ অভিযোগে ‘বাংলার সৌরভ’-এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনযন্ত্র স্থাপনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। এমনকি জাহাজের অধিনায়ক আপত্তি জানিয়েছিলেন—এমন দাবিও ওই নথিতে রয়েছে।

তবে এটি এখনো অভিযোগ—প্রমাণিত সত্য নয়।

অতএব দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, যন্ত্রটির স্থাপন পদ্ধতি, অনুমোদন, পরিদর্শন এবং বিস্ফোরণের ফরেনসিক/কারিগরি তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

দুর্ঘটনার পর জাহাজ দুটি আর ফেরেনি

দুর্ঘটনার পর বিএসসি দুই জাহাজ দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ করার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। নতুন জাহাজ সংগ্রহ না হওয়া পর্যন্ত চার্টার করা জাহাজের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছিল।

এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিএসসির বোর্ড দুই ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। আন্তর্জাতিক দরপত্রে প্রথমে ৪০ কোটি ৪৪ লাখ টাকার প্রস্তাব আসে।

পরবর্তীতে প্রথম দরদাতা নির্ধারিত অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা জিরি সুবেদার শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে জাহাজ দুটি ৪৫ কোটি ৮৬ লাখ ৬১ হাজার টাকা—কর ও ভ্যাটসহ—বিক্রি করা হয়। ২০২৫ সালের ৫ মার্চ জাহাজ দুটি হস্তান্তর করা হয় বলে বিএসসি জানায়।

৩৮ বছরের পুরোনো জাহাজ—বয়সও কি ছিল নিরাপত্তার প্রশ্ন?

সরকারি নথিভিত্তিক একটি জাহাজ তালিকায় ‘বাংলার জ্যোতি’ ও ‘বাংলার সৌরভ’-এর নির্মাণসাল ১৯৮৬ এবং বয়স ৩৮ বছর হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

অন্যদিকে বিএসসি জানিয়েছে, জাহাজ দুটি ১৯৮৭ সালে ডেনমার্ক থেকে কেনা হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় ব্যবহারের পর দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আর ব্যবহারযোগ্য ছিল না।

এখানেই আরেকটি অনুসন্ধানী প্রশ্ন:

একটি জাহাজের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার পরও সেটিকে কতটা নিরাপদভাবে পরিচালনা করা হয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়েছিল?

এখন তদন্তের দাবি আরও গুরুত্বপূর্ণ

দুটি জাহাজের ভবিষ্যৎ শেষ হয়েছে স্ক্র্যাপ বিক্রির মাধ্যমে। কিন্তু চারটি প্রাণের মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্নের নিষ্পত্তি শুধু জাহাজ বিক্রি করে শেষ হওয়ার কথা নয়।

দৈনিক বাস্তব কণ্ঠ মনে করে, পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহির জন্য অন্তত পাঁচটি নথি জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন—

প্রথমত, দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন।

দ্বিতীয়ত, ‘বাংলার সৌরভ’-এর সনদ স্থগিত ও পরবর্তী পুনর্বহালের নথি।

তৃতীয়ত, দুই জাহাজের সর্বশেষ নিরাপত্তা ও কারিগরি পরিদর্শন প্রতিবেদন।

চতুর্থত, জাহাজে বিদ্যুৎ উৎপাদনযন্ত্র স্থাপনের অনুমোদন ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের নথি।

পঞ্চমত, দুর্ঘটনার আগে বন্দর কর্তৃপক্ষের সতর্কবার্তার পর বিএসসি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী কী ব্যবস্থা নিয়েছিল তার রেকর্ড।

কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই যতক্ষণ না স্বাধীন তদন্তে তা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু দুর্ঘটনার আগে ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কতা, সনদ-সংক্রান্ত প্রশ্ন এবং পরপর দুটি অগ্নিকাণ্ড—এই ঘটনাপ্রবাহকে সামনে রেখে জবাবদিহিমূলক স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করারও সুযোগ নেই।

বাস্তব কণ্ঠের অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন

যে ঝুঁকি দুর্ঘটনার আগেই নথিতে উঠে এসেছিল, সেই ঝুঁকি কমাতে কে কী ব্যবস্থা নিয়েছিল—আর সেই ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল কি না, তার উত্তর কি এখনো পাওয়া গেছে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—‘বাংলার জ্যোতি’ ও ‘বাংলার সৌরভ’-এর ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা ছিল, নাকি আগাম সতর্কতার পরও প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কোনো গুরুতর ব্যর্থতা ছিল।
বাস্তব কন্ঠ
Developed by ZapStudio Network
🖨️ প্রিন্ট 💾 JPG 📄 PDF