Logo
প্রিন্টের তারিখ: 21 October 2026 | প্রকাশের তারিখ: Oct 22, 2026

সংবাদ শিরোনাম : ৯৭% কাজ শেষে বাতিল বিআরটি প্রকল্প: ভাঙতেই ব্যয় হবে ৪৫ কোটি টাকা

৯৭% কাজ শেষে বাতিল বিআরটি প্রকল্প: ভাঙতেই ব্যয় হবে ৪৫ কোটি টাকা


​বিশেষ প্রতিনিধি | প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬

​দীর্ঘ ১৪ বছরের সীমাহীন ভোগান্তি, পদে পদে নকশাগত ত্রুটি এবং প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা খরচের পর অবশেষে বাতিল করা হলো বহুল আলোচিত ঢাকা-গাজীপুর বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। অবকাঠামোগত কাজ ৯৭ শতাংশ শেষ হওয়া সত্ত্বেও প্রকল্পটি শতভাগ ব্যর্থতায় রূপ নেওয়ায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এটি বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

​এখন বিআরটির জন্য নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে সড়কটি সাধারণ ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে। আর এই অবকাঠামো সরাতেই ভাঙার খরচ হিসেবে গুণতে হবে আরও অন্তত ৪৫ কোটি টাকা।

​কেন এই সিদ্ধান্ত?

​গত রোববার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চারটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। সবদিক বিবেচনা করে সরকার প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বাতিল করে বিদ্যমান পথকে সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়।

​প্রকল্পের অন্যতম বড় ব্যর্থতা ছিল বিআরটি চলাচলের জন্য নির্ধারিত বিশেষ বাস সংগ্রহ করতে না পারা এবং সুনির্দিষ্ট নকশাগত ত্রুটি। এছাড়া বাসসেবা চালু না হলেও নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিগত ১৪ বছর ধরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহনকে পোহাতে হয়েছে চরম দুর্ভোগ।

​ভেঙে ফেলার নতুন পরিকল্পনা ও হিসাব

​নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিআরটির বিশেষ লেন ও স্টেশনগুলো অপসারণ করে সড়কটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে:

  • ​স্টেশন ও লেনের পরিবর্তন: করিডোরে নির্মিত ২৫টি বিশেষ বাস স্টেশন ও লেন বিভাজক ভাঙা হবে।
  • ​ছয় লেন মহাসড়ক: সড়কের মাঝের বিভাজক সরিয়ে দুই পাশে ৩টি করে মোট ৬ লেনের সাধারণ পথ তৈরি করা হবে।
  • ​উড়ালপথের সম্প্রসারণ: প্রকল্পের আওতায় নির্মিত দুই লেনের দুটি উড়ালপথ থেকে বিআরটি লেন তুলে নিয়ে চার লেনের উন্মুক্ত মহাসড়কে রূপ দেওয়া হবে।
  • ​ব্যয় ও ক্ষতি: অবকাঠামো অপসারণে ব্যয় হবে ৪৫ কোটি টাকা এবং সড়ক প্রশস্তকরণে আরও ২৭ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্টেশনগুলো ভেঙে প্রাপ্ত মালামাল মাত্র ৭ কোটি টাকায় বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর।
  • ​কোম্পানি গুটিয়ে নেওয়া: বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত 'ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি' বন্ধ করে এর সার্বিক দায়িত্ব সওজ অধিদপ্তরের অধীনে নেওয়া হচ্ছে।
  • ​"সড়ক নিরাপত্তা ও অবকাঠামোসংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সে অনুযায়ী কাজ চলছে।"

    — মো. মনিরুজ্জামান, প্রধান প্রকৌশলী, সওজ অধিদপ্তর।


    ​এক নজরে বিআরটি প্রকল্পের ইতিহাস

    • ​সূচনা: ২০১২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ (বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী) এই প্রকল্প হাতে নেয়।
    • ​মূল উদ্দেশ্য: ঢাকার সঙ্গে গাজীপুর ও আশপাশের অঞ্চলের যাত্রীদের যানজটমুক্ত দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করা।
    • ​মূল প্রাক্কলিত ব্যয়: ২ হাজার ৩৯ কোটি টাকা (বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ২০১৭ পর্যন্ত)।
    • ​সর্বশেষ খরচ: দফায় দফায় ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায়, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে।
    • ​অর্থায়ন: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (AFD) এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (GEF)।

    ​বৈশ্বিক চিত্র বনাম দেশীয় ব্যর্থতা

    ​'গ্লোবাল বিআরটি ডেটা'-র তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১৯১টি শহরে সফলভাবে বিআরটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ মানুষ যাতায়াত করেন। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতের ১৩টি শহরে বিআরটি চালুর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ যাত্রী সেবা পাচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ব্যবস্থা সফল হলেও পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে বাংলাদেশে বিআরটি কেবল বিপুল অর্থ অপচয় ও জনভোগান্তির স্মারক হিসেবেই থেকে গেল।

বাস্তব কন্ঠ
Developed by ZapStudio Network
🖨️ প্রিন্ট 💾 JPG 📄 PDF