বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা:
কৈশোরে ইট ভাঙা, রডের কাজ কিংবা কৃষিশ্রমিক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ—জীবনের পদে পদে চরম অভাব ও প্রিয়জন হারানোর তীব্র যন্ত্রণা। সব বাধা পেরিয়ে, প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রমে অবশেষে বিসিএস ক্যাডার হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আমিনুল হক মাখন। সম্প্রতি ঘোষিত ৪৬তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্তির পাশাপাশি ৪৯তম বিশেষ বিসিএসেও একই ক্যাডারে গ্যাজেটভুক্ত হয়েছেন তিনি।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার কান্দানিয়া ভাটিপাড়া গ্রামের সন্তান মাখনের জীবনসংগ্রাম রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। মাত্র সাত মাস বয়সে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে তার। শৈশবে মায়ের মমতা ছাড়াই দাদির আদরে বেড়ে ওঠেন তিনি। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার পর প্রথম নিজের মায়ের দেখা পান। ২০১২ সালে যখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, তখন পরম আশ্রয় বাবাও মারা যান।
নিঃস্ব মাখনের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া একসময় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তবে হাল ছাড়েননি তিনি। ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণি থেকেই পরিবারের জীবিকা ও নিজের পড়ার খরচের জন্য ইট ভাঙা, রডের কাজ ও কৃষিশ্রমিকের কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে নবম শ্রেণি থেকে শুরু করেন টিউশনি। প্রতিদিন ৭ কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে কলেজে যেতেন তিনি।
আমিনুল হক মাখন তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র ছিল। চাচা রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। আমার পড়ার খরচের ৯৫ শতাংশই জোগাড় হয়েছে গ্রামের মানুষের সহযোগিতায়। বন্ধুরা যখন খেলত, আমাকে তখন কাজ করতে হতো। তখন মনে হয়েছে, আমার সামনে অন্য কোনো পথ নেই—পড়াশোনাই একমাত্র সম্বল।”
পরিবারের পাশাপাশি কান্দানিয়া গ্রামের সাধারণ মানুষও মাখনের পাশে এসে দাঁড়ান। কেউ বই-খাতা, কেউ পোশাক, আবার কেউ পরীক্ষার ফি দিয়ে সহায়তা করেছেন। স্থানীয় অধিবাসী মাসুদ করিম বলেন, “ছোটবেলা থেকেই মাখন অত্যন্ত মেধাবী ছিল। আমরা জানতাম সুযোগ পেলে সে ভালো করবে। আজ সে আমাদের পুরো গ্রামের গর্ব।”
সংগ্রামের পথ পেরিয়ে ২০১৫ সালে কান্দানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ২০১৭ সালে শাহাবুদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগে ভর্তি হন মাখন। বিশ্ববিদ্যালয়েও টিউশনি ও শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে পড়ার খরচ চালান। ২০২১ সালের মার্চ থেকে কোনো কোচিং ছাড়াই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সহায়তায় বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন তিনি। কঠোর প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ পাঁচটি বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হন তিনি।
মাখনের এই সাফল্যে আনন্দাশ্রু ঝরছে তাকে লালন-পালন করা চাচা আবদুল খালেক ও চাচি মিনারা খাতুনের চোখে। চাচি মিনারা খাতুন আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, “নিজের বুকের দুধ খাইয়ে ওরে বড় করছি। ওর বাবা মারা যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিলেন চার ছেলেকে যেন এক চোখে দেখি। কোনো দিন মাখনকে আলাদা ভাবিনি।”
বর্তমানে বিবাহিত মাখন তার এই সাফল্যের পেছনে স্ত্রী সাবিকুন্নাহার সিনথিয়ার মানসিক সমর্থনের কথা স্মরণ করেন। তবে এই আনন্দের দিনেও তার একমাত্র আক্ষেপ, যে বাবা ও দাদি তার জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্ট করেছেন, তারা আজ এই সফলতা দেখে যেতে পারলেন না।
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে আমিনুল হক মাখন বলেন, “সফলতার জন্য সততা, পরিশ্রম ও ধৈর্য প্রয়োজন। যার মধ্যে এই তিনটি গুণ থাকবে, সে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করে সফল হতে পারবে।”