বিশেষ প্রতিবেদক:
রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় মূল সড়কসংলগ্ন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রায় ১১ একর মূল্যবান জমি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অবৈধ দখলে রেখেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। বর্তমান বাজারে এই জমির আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। বারবার ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও হাতবদল হলেও জমি উদ্ধারে রাজউকের তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। অভিযোগ উঠেছে, সংস্থাটিরই কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরোক্ষ মদদ ও মাসোহারা বাণিজ্যের কারণেই থমকে আছে জমি মুক্তির প্রক্রিয়া।
অধিগ্রহণের ইতিহাস ও আইনি বাস্তবতা
নথিপত্র অনুযায়ী, তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি)—যা বর্তমানে রাজউক নামে পরিচিত—আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ১৯৬২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বাড্ডা মৌজার সিএস দাগে ১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। একই বছরের ২৫ এপ্রিল ঢাকা জেলা প্রশাসন (এল এ কেস নম্বর ১৩৮/৬১-৬২) রাজউককে জমিটির আইনানুগ দখল বুঝিয়ে দেয় এবং হস্তান্তরের সনদ জারি করে। ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ডিআইটি পুনর্গঠিত হয়ে রাজউক রূপ নিলেও জমির চূড়ান্ত মালিকানা সংস্থাটির নামেই বহাল থাকে।
রিটের বেড়াজালে জট, জমজমাট ব্যবসা
জমিটি হাতছাড়া রাখতে ২০০৫ সাল থেকে ধাপে ধাপে হাইকোর্টে ৫টি রিট মামলা দায়ের করে প্রভাবশালী চক্রটি। ২০০৫ সালে রাজউকের তৎকালীন আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে গেলে প্রথম ধাক্কায় মামলা ঠুকে দেয় সংক্ষুব্ধ পক্ষ। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে 'মেরুল কাঁচাবাজার সমিতি'সহ (মামলা নম্বর ২১৪১/২০০৭) অন্যান্য পক্ষ মোট পাঁচটি রিট করে।
দীর্ঘ ২১ বছর ধরে রিটগুলোর চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি না হওয়ার সুযোগে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল বাঁশের আড়ত, মৎস্য আড়ত, মুরগির বাজার ও বিস্তীর্ণ বস্তি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আড়ত ও বাজারগুলো থেকে প্রতি মাসে বিপুল অংকের টাকা তোলা হয়, যার একটি বড় অংশ পৌঁছায় রাজউকের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে।
বেদখল জমিতে সাইনবোর্ড, নেতৃত্বের পটপরিবর্তন
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, রামপুরা ব্রিজ পার হয়ে মূল সড়কের পাশেই গড়ে উঠেছে এই বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য। রাজউকের জমি হওয়া সত্ত্বেও সেখানে টাঙানো হয়েছে ব্যক্তিমালিকানার সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডে মোহাম্মদ শরীফ ভূইয়া ও বাবু চন্দ্র দাসকে আমমোক্তার দেখিয়ে সিএস/এসএ-১২৪৩, আরএস-৩০৩৯ এবং সিটি-১৫০০৯ দাগের আওতায় ২৭.৫০ শতাংশ জমি নিজেদের দাবি করা হয়েছে।
এদিকে গত ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জমি দখলের নিয়ন্ত্রণেও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে স্থানীয় বিএনপি সমর্থিত কিছু নেতাকর্মী ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় আড়তের চাঁদা তোলা এবং নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
রাজউক প্রধানের হতাশা
সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ স্থবিরতা ও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম। তিনি জানান, "রাজউকের বিপুল পরিমাণ জমির বিরুদ্ধে এমন বহু রিট মামলা ঝুলে রয়েছে। মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োজিত থাকলেও রাজউকের এমন অনেক কর্মকর্তা আছেন, যারা কাজ না করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কারণ কাজ না করার মধ্যেই তাদের ব্যক্তিগত লাভ জড়িত।"
ঢাকার কেন্দ্রস্থলে যেখানে এক চিলতে জমির মূল্য আকাশচুম্বী, সেখানে সরকারি এত বড় একটি সম্পত্তির বছরের পর বছর বেদখল থাকা রাজউকের সার্বিক প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আইনি তৎপরতার ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়েছে।